রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫/১-এর অথরাইজড অফিসার সাইদা ইসলামের বিরুদ্ধে ভবনের নকশা অনুমোদন, ফাইল নিষ্পত্তি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় অনিয়ম, দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন বাড়ির মালিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনুমোদনের ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা, অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জোন-৫/১ এলাকায় পাঁচ থেকে ছয়তলা আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, ভবনের উচ্চতা ছয়তলা হোক কিংবা ১০ থেকে ১২ তলা—নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এক বাড়ির মালিকের অভিযোগ, সরকারি ফি ও নির্মাণ ব্যয়ের বাইরে শুধু নকশা অনুমোদনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ি নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়বে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ নিয়ে আপত্তি জানালে সাইদা ইসলাম নাকি বলেন, এই অর্থের ভাগ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও দিতে হয়। তবে তাঁর নামে প্রচারিত এই বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যও জানা যায়নি।
অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ এবং অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে রাজউকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে অভিযানের সময় বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কিংবা মিটার খুলে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অবৈধ নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না। ফলে অভিযানের পর আবারও নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাঁদের দাবি, অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও সমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে কোন কোন ভবনের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট নথি বা সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ইমারত পরিদর্শকদের কাজেও সাইদা ইসলাম হস্তক্ষেপ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো পরিদর্শক নিয়ম অনুযায়ী ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি বা ব্যবস্থা নিতে চাইলে তাঁকে আগে অথরাইজড অফিসারকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে নির্দিষ্ট কিছু ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব বা শিথিলতা তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নকশা অনুমোদন ও ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাইদা ইসলামের ব্যক্তিগত আইডিতে অর্ধশতাধিক অনুমোদনের ফাইল দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অতিরিক্ত অর্থের দাবি পূরণ না হলে কিছু ফাইল এগোয় না। ফলে সেবাগ্রহীতাদের মাসের পর মাস রাজউক কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।
তবে ফাইলের প্রকৃত সংখ্যা, সেগুলো কত দিন ধরে আটকে রয়েছে এবং নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে রাজউকের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ফাইলের নথি ও দাপ্তরিক রেকর্ড যাচাই করা হলে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।?
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮-এর আওতায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন, নকশা অনুসরণ এবং বিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। অনুমোদিত নকশা ও প্রযোজ্য শর্ত ভঙ্গ করে নির্মাণ করা হলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সাইদা ইসলাম নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সরাসরি জবাব না দিয়ে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতি ও বিধিমালার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তাঁর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য, অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা এবং রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ের নকশা অনুমোদনের ফাইল, ফাইল নিষ্পত্তির সময়সীমা, মোবাইল কোর্টের নথি এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা হোক।
রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর উন্নয়ন সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সুনাম রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।।




















