দিনাজপুরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন, ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, নিজের ও স্ত্রীর নামে তিনি জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, দোকান ও গোডাউনসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
অভিযোগ অনুযায়ী, দিনাজপুরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে শাহনুর রশিদ নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্ত প্রণয়ন এবং নিম্নমানের কাজ করানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন কার্যাদেশের বিপরীতে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া দিনাজপুরের পুলহাট থেকে খানপুর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনা থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
শাহনুর রশিদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা তুলে আত্মীয়স্বজনের কাছে সরিয়ে রেখেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে সুবিধা নেওয়া এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের অবস্থান ধরে রাখতে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় গ্রহণের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রাপ্ত তথ্য ও অভিযোগে শাহনুর রশিদের নামে বিভিন্ন সময়ে কেনা একাধিক জমি, প্লট, দোকান, গোডাউন ও ফ্ল্যাটের বিবরণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
* ২০১০ সালের ২৪ আগস্ট: বিরামপুরে দুটি দোকান ও গোডাউন কেনার তথ্য রয়েছে। এগুলোর মূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দলিল নম্বর ৪৫৯০।
* ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর: বিরামপুর মৌজায় ৩ শতাংশ জমি কেনেন বলে উল্লেখ রয়েছে। দলিল নম্বর ৩১৪৩।
* ২০১১ সালের ২২ জুন: বাঁশবাড়িয়া মৌজায় ৫১.৫ শতাংশ জমি কেনার তথ্য রয়েছে। দলিল নম্বর ২৮৮৫।
* ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট: বিরামপুর মৌজায় ৭.৫ শতাংশ জমি কেনার তথ্য রয়েছে। দলিল নম্বর ৪০৮৩।
* ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর: বাঁশবাড়িয়া মৌজায় আরও ৩৩ শতাংশ জমি কেনার তথ্য রয়েছে। দলিল নম্বর ৫০৯৯।
* ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি: রংপুরের সাতগাড়া মৌজায় ৪.০৮ শতাংশ জমি কেনেন বলে উল্লেখ রয়েছে। দলিল নম্বর ১২৭৫/১৮।
* ২০২০ সালে: একই মৌজায় ১৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় আরও একটি প্লট কেনার তথ্য রয়েছে। দলিল নম্বর ৮৩৮৮।
* ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি: বিরামপুর মৌজায় ২৫ লাখ টাকায় ১১.৫ শতাংশ জমি কেনার তথ্য রয়েছে। দলিল নম্বর ৮৭৪।
* বিরামপুরের কানিকাঠাল মৌজায়: ৩১৭৬ ও ৩১৭৭ নম্বর দলিলে যথাক্রমে ৯৭.৫ শতাংশ ও ৯১.৭৫ শতাংশ জমি কেনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
* ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর: রাজধানীর খিলগাঁওয়ের উত্তর মেরাদিয়ায় একটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্য রয়েছে।
* ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর: রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়ায় আরও একটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। দলিল নম্বর ৯৮৭৫।
তবে এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য, মালিকানার অবস্থা এবং অর্থের প্রকৃত উৎস সংশ্লিষ্ট দলিল ও আর্থিক নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শাহনুর রশিদ তাঁর আয়কর নথিতে সরকারি চাকরি, কৃষি ও দোকানভাড়া থেকে পাওয়া অর্থকে সম্পদ অর্জনের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মাসিক সর্বসাকুল্যে বেতন প্রায় ৫৪ হাজার টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এ অবস্থায় তাঁর আয়, ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন এবং ঘোষিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা দুদকের অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুদকের দিনাজপুর জেলা কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তবে অনুসন্ধান বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করতে রাজনৈতিকভাবে তৎপরতা চালানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তার পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।





















