১২:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

রাজউকের ‘অফিসার’ থেকে বিদেশে পাড়ি, দেশে ফেরেননি একাধিক কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:৫৫:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫১১

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিদেশে পাড়ি জমিয়ে আর দেশে ফেরেননি—এমন তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। তাদের কেউ অনুমোদিত ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর কর্মস্থলে যোগ দেননি, আবার কেউ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই দেশ ছেড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইমারত নির্মাণ তদারকি ও নকশা অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই কেউ কেউ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগের তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হলে তাদের একটি অংশ বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফেরেননি।

তবে রাজউক কর্তৃপক্ষ বলছে, অনুমোদন ছাড়া বিদেশে যাওয়া কিংবা ছুটি শেষে কর্মস্থলে না ফেরার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ জোন ৪/১-এর সাবেক অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে এমনই একটি উদাহরণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তার বিদেশ ভ্রমণের ছুটির আবেদন নিয়ে তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞার সন্দেহ তৈরি হলে ছুটি নামঞ্জুর করা হয়। পরে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের মাধ্যমে ১৫ দিনের ছুটি নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি আর দেশে ফেরেননি।

গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে রাজউকে প্রেষণে আসা নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ হোসেন ২০২০ সালের মার্চে তিন বছরের জন্য পিএইচডি করতে বিদেশে যান। নির্ধারিত সময় শেষ হলেও তিনি আর কর্মস্থলে যোগ দেননি বলে জানা গেছে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান রাজউকের সাবেক অথরাইজড অফিসার মো. ইমরুল হাসান। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি প্রয়োজনীয় অনুমতি নেননি। সরকারি পাসপোর্টের পাশাপাশি অন্য একটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিদেশে যাওয়ার পর তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যানকে ফোন করে তিনি আর দেশে ফিরবেন না এবং চাকরিতে যোগ দেবেন না বলে জানান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ইমরুল হাসান দীর্ঘদিন রাজউকের জোন-৩ ও জোন-৪-এর দায়িত্বে ছিলেন। তার আওতাধীন ছিল গুলশান, বনানী, বারিধারা, খিলক্ষেত, পূর্বাচল, বসুন্ধরা, মিরপুর, নিকুঞ্জ, ভাষানটেক ও পল্লবীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন। তার বিরুদ্ধে জ্বালানি খাতে প্রায় ১২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিসহ একটি বিভাগীয় মামলাও রয়েছে বলে জানা গেছে।

ইমরুল হাসানের খালাতো ভাই অথরাইজড অফিসার শেখ মাহাব্বির রানিও বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

২০১৬ সালে রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রথমদিকে জোন-৮-এ দায়িত্ব পালন করেন। পরে অথরাইজড অফিসার হিসেবে জোন ৩/১-এর দায়িত্ব পান। এরপর বিদেশে পাড়ি জমান তিনি।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে জোন-৮/২-এর অথরাইজড অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম (সাইফ) এক বছরের মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য সরকারি অনুমতি নিয়ে জাপানে যান। তবে পরে জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তিনিও দেশে কিংবা রাজউকের চাকরিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।

রাজউকের আরেক আলোচিত অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াসও একসময় অনুমতি ছাড়া বিদেশে গিয়েছিলেন। বিদেশে স্থায়ী হতে না পেরে পরে দেশে ফিরে চাকরিতে যোগ দেন।

এ ঘটনায় রাজউক তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করলেও পরবর্তীতে প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় মামলাটি মীমাংসা করে তিনি আবার চাকরিতে ফেরেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি জোন-৭/১-এর দায়িত্বে রয়েছেন।

বিদেশে যাওয়ার সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন জোন-১/১-এর অথরাইজড অফিসার শেখ মুহাম্মদ এহসানুল ইমাম—এমন দাবি করেছেন রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তা।

১১ বছরের চাকরিজীবনে জোন ১, ২, ৩, ৫ ও ৭-এ দায়িত্ব পালনকালে বড় কয়েকটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সরকারি খাস জমি একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার অভিযোগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার কয়েকজন আসামি অব্যাহতি পেলেও তিনি অব্যাহতি পাননি বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় তিনি যেকোনো সময় বিদেশে পাড়ি জমাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রাজউকের ‘প’ আদ্যক্ষরের দুই অথরাইজড অফিসারও বিদেশে চলে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের একজনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। অন্যজনের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে ইমারত নির্মাণ তদারকি পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

তাদের একজন বর্তমানে রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যজন সম্প্রতি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অথরাইজড অফিসারের ক্ষমতা পেয়েছেন।

রাজউকে বর্তমানে ২৪টি জোন থাকলেও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন ১৮ থেকে ২০ জন অথরাইজড অফিসার। অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ অবৈধ সুবিধা ছাড়া কোনো ফাইল এগিয়ে নেন না।

অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), সেটব্যাকসহ বিভিন্ন বিধিবিধান উপেক্ষা করে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে। ভবনের উচ্চতা বাড়লে ঘুষের অঙ্কও বাড়ে। ১০ তলার বেশি ভবনের ক্ষেত্রে তা ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ৫ থেকে ৭ তলা ভবনের জন্য ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। বড় প্রকল্প কিংবা বিধিমালাগত জটিলতা থাকলে এই অঙ্ক আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের একটি অংশ কাজ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, অনুমোদন ছাড়া বিদেশে যাওয়া কিংবা নির্ধারিত ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে না আসা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, চাকরিতে থাকা অবস্থায় অনুমোদন ছাড়া বিদেশে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত বিভাগীয় মামলা করার পাশাপাশি অভিযোগগুলো দুদকে পাঠানো যেতে পারে।

তার মতে, দুদক দুর্নীতির পাশাপাশি অর্থপাচারের বিষয়ও তদন্ত করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পৃথকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিদেশে গিয়ে চাকরিতে আর না ফিরলে বিষয়টি শুধু চাকরিবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সম্ভাব্য অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের বিষয়ও সমান্তরালভাবে তদন্ত করা জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত

পুলিশের সহায়তায় ‘পিচ্চি রাজা’র পালানোর অভিযোগ, এসআইসহ গ্রেপ্তার ৩

রাজউকের ‘অফিসার’ থেকে বিদেশে পাড়ি, দেশে ফেরেননি একাধিক কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ

আপডেট: ০৯:৫৫:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিদেশে পাড়ি জমিয়ে আর দেশে ফেরেননি—এমন তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। তাদের কেউ অনুমোদিত ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর কর্মস্থলে যোগ দেননি, আবার কেউ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই দেশ ছেড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইমারত নির্মাণ তদারকি ও নকশা অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই কেউ কেউ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগের তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হলে তাদের একটি অংশ বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফেরেননি।

তবে রাজউক কর্তৃপক্ষ বলছে, অনুমোদন ছাড়া বিদেশে যাওয়া কিংবা ছুটি শেষে কর্মস্থলে না ফেরার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ জোন ৪/১-এর সাবেক অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে এমনই একটি উদাহরণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তার বিদেশ ভ্রমণের ছুটির আবেদন নিয়ে তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞার সন্দেহ তৈরি হলে ছুটি নামঞ্জুর করা হয়। পরে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের মাধ্যমে ১৫ দিনের ছুটি নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি আর দেশে ফেরেননি।

গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে রাজউকে প্রেষণে আসা নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ হোসেন ২০২০ সালের মার্চে তিন বছরের জন্য পিএইচডি করতে বিদেশে যান। নির্ধারিত সময় শেষ হলেও তিনি আর কর্মস্থলে যোগ দেননি বলে জানা গেছে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান রাজউকের সাবেক অথরাইজড অফিসার মো. ইমরুল হাসান। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি প্রয়োজনীয় অনুমতি নেননি। সরকারি পাসপোর্টের পাশাপাশি অন্য একটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিদেশে যাওয়ার পর তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যানকে ফোন করে তিনি আর দেশে ফিরবেন না এবং চাকরিতে যোগ দেবেন না বলে জানান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ইমরুল হাসান দীর্ঘদিন রাজউকের জোন-৩ ও জোন-৪-এর দায়িত্বে ছিলেন। তার আওতাধীন ছিল গুলশান, বনানী, বারিধারা, খিলক্ষেত, পূর্বাচল, বসুন্ধরা, মিরপুর, নিকুঞ্জ, ভাষানটেক ও পল্লবীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন। তার বিরুদ্ধে জ্বালানি খাতে প্রায় ১২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিসহ একটি বিভাগীয় মামলাও রয়েছে বলে জানা গেছে।

ইমরুল হাসানের খালাতো ভাই অথরাইজড অফিসার শেখ মাহাব্বির রানিও বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

২০১৬ সালে রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রথমদিকে জোন-৮-এ দায়িত্ব পালন করেন। পরে অথরাইজড অফিসার হিসেবে জোন ৩/১-এর দায়িত্ব পান। এরপর বিদেশে পাড়ি জমান তিনি।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে জোন-৮/২-এর অথরাইজড অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম (সাইফ) এক বছরের মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য সরকারি অনুমতি নিয়ে জাপানে যান। তবে পরে জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তিনিও দেশে কিংবা রাজউকের চাকরিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।

রাজউকের আরেক আলোচিত অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াসও একসময় অনুমতি ছাড়া বিদেশে গিয়েছিলেন। বিদেশে স্থায়ী হতে না পেরে পরে দেশে ফিরে চাকরিতে যোগ দেন।

এ ঘটনায় রাজউক তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করলেও পরবর্তীতে প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় মামলাটি মীমাংসা করে তিনি আবার চাকরিতে ফেরেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি জোন-৭/১-এর দায়িত্বে রয়েছেন।

বিদেশে যাওয়ার সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন জোন-১/১-এর অথরাইজড অফিসার শেখ মুহাম্মদ এহসানুল ইমাম—এমন দাবি করেছেন রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তা।

১১ বছরের চাকরিজীবনে জোন ১, ২, ৩, ৫ ও ৭-এ দায়িত্ব পালনকালে বড় কয়েকটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সরকারি খাস জমি একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার অভিযোগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার কয়েকজন আসামি অব্যাহতি পেলেও তিনি অব্যাহতি পাননি বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় তিনি যেকোনো সময় বিদেশে পাড়ি জমাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রাজউকের ‘প’ আদ্যক্ষরের দুই অথরাইজড অফিসারও বিদেশে চলে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের একজনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। অন্যজনের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে ইমারত নির্মাণ তদারকি পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

তাদের একজন বর্তমানে রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যজন সম্প্রতি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অথরাইজড অফিসারের ক্ষমতা পেয়েছেন।

রাজউকে বর্তমানে ২৪টি জোন থাকলেও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন ১৮ থেকে ২০ জন অথরাইজড অফিসার। অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ অবৈধ সুবিধা ছাড়া কোনো ফাইল এগিয়ে নেন না।

অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), সেটব্যাকসহ বিভিন্ন বিধিবিধান উপেক্ষা করে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে। ভবনের উচ্চতা বাড়লে ঘুষের অঙ্কও বাড়ে। ১০ তলার বেশি ভবনের ক্ষেত্রে তা ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ৫ থেকে ৭ তলা ভবনের জন্য ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। বড় প্রকল্প কিংবা বিধিমালাগত জটিলতা থাকলে এই অঙ্ক আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের একটি অংশ কাজ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, অনুমোদন ছাড়া বিদেশে যাওয়া কিংবা নির্ধারিত ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে না আসা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, চাকরিতে থাকা অবস্থায় অনুমোদন ছাড়া বিদেশে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত বিভাগীয় মামলা করার পাশাপাশি অভিযোগগুলো দুদকে পাঠানো যেতে পারে।

তার মতে, দুদক দুর্নীতির পাশাপাশি অর্থপাচারের বিষয়ও তদন্ত করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পৃথকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিদেশে গিয়ে চাকরিতে আর না ফিরলে বিষয়টি শুধু চাকরিবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সম্ভাব্য অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের বিষয়ও সমান্তরালভাবে তদন্ত করা জরুরি।