১১:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

কারাগারে গেলেই কি এমপি পদ বাতিল হয়? গাজী নজরুলের ঘটনায় সংবিধান কী বলে

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:৪০:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫১২

কোনো সংসদ সদস্য ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলে কি তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়? সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম কারাগারে যাওয়ার পর নতুন করে সামনে এসেছে এমন প্রশ্ন।

দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় জামিন না পেয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন গাজী নজরুল ইসলাম। এর আগে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গত জুলাইয়ে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। তখনও তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

সম্প্রতি মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া এবং তাঁর পদত্যাগের পর আসনটি শূন্য ঘোষণার ঘটনাও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

তবে আইন ও সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, একজন এমপিকে দল থেকে বহিষ্কার করা এবং তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারানো একই বিষয় নয়।

শুধু কারাগারে গেলেই আসন শূন্য নয়

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর না পেরোলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য থাকার অযোগ্য হবেন।

অর্থাৎ, শুধু কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বা বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে থাকাই সংসদ সদস্য পদ বাতিলের স্বয়ংক্রিয় কারণ নয়। এখানে আদালতের চূড়ান্ত রায় ও দণ্ডের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, কোনো মামলায় সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেই তাঁর সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। বিচারাধীন মামলায় কারাগারে থাকা এবং আদালতে অপরাধে চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত হওয়া এক বিষয় নয়।

তাই গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে যে মামলায় কারাগারে রয়েছেন, শুধু সেই কারাবাসের কারণে সাতক্ষীরা-৪ আসন শূন্য হয়ে যায় না।

৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে সংবিধানের ৬৭(১)(খ) অনুচ্ছেদে। এতে বলা হয়েছে, সংসদের অনুমতি ছাড়া কোনো সদস্য টানা ৯০ কার্যদিবস সংসদের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর আসন শূন্য হতে পারে।

তবে কারাগারে থাকলেই এই বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে—এমনটি সংবিধানে বলা নেই। এক্ষেত্রে সংসদের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না এবং সাংবিধানিক শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা বিবেচনার বিষয়।

অর্থাৎ গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে দীর্ঘদিন সংসদে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি আলাদাভাবে সাংবিধানিকভাবে বিবেচিত হতে পারে।

যেসব কারণে এমপির আসন শূন্য হতে পারে

সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ না নেওয়া;;

সংবিধানের ৬৬(২)-এ উল্লেখিত কোনো অযোগ্যতায় পড়া;

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়া;

এবং সংসদ সদস্য নিজে স্পিকারের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র দেওয়া।

গাজী নজরুল ও মিষ্টির ক্ষেত্রে পার্থক্য কোথায়?

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্ব তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং তিনি নিজে পদত্যাগপত্র দেন। ফলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া সংবিধানে নির্ধারিত পদত্যাগের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু তিনি নিজে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেননি।

ফলে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ হারানো—দুটি আলাদা বিষয়। একইভাবে, কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকাও নিজে থেকেই সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কারণ নয়। সংবিধানে নির্ধারিত অযোগ্যতা বা আসন শূন্য হওয়ার কোনো শর্ত পূরণ হলে তবেই পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হবে।

সর্বাধিক পঠিত

পুলিশের সহায়তায় ‘পিচ্চি রাজা’র পালানোর অভিযোগ, এসআইসহ গ্রেপ্তার ৩

কারাগারে গেলেই কি এমপি পদ বাতিল হয়? গাজী নজরুলের ঘটনায় সংবিধান কী বলে

আপডেট: ১০:৪০:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

কোনো সংসদ সদস্য ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলে কি তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়? সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম কারাগারে যাওয়ার পর নতুন করে সামনে এসেছে এমন প্রশ্ন।

দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় জামিন না পেয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন গাজী নজরুল ইসলাম। এর আগে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গত জুলাইয়ে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। তখনও তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

সম্প্রতি মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া এবং তাঁর পদত্যাগের পর আসনটি শূন্য ঘোষণার ঘটনাও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

তবে আইন ও সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, একজন এমপিকে দল থেকে বহিষ্কার করা এবং তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারানো একই বিষয় নয়।

শুধু কারাগারে গেলেই আসন শূন্য নয়

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর না পেরোলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য থাকার অযোগ্য হবেন।

অর্থাৎ, শুধু কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বা বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে থাকাই সংসদ সদস্য পদ বাতিলের স্বয়ংক্রিয় কারণ নয়। এখানে আদালতের চূড়ান্ত রায় ও দণ্ডের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, কোনো মামলায় সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেই তাঁর সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। বিচারাধীন মামলায় কারাগারে থাকা এবং আদালতে অপরাধে চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত হওয়া এক বিষয় নয়।

তাই গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে যে মামলায় কারাগারে রয়েছেন, শুধু সেই কারাবাসের কারণে সাতক্ষীরা-৪ আসন শূন্য হয়ে যায় না।

৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে সংবিধানের ৬৭(১)(খ) অনুচ্ছেদে। এতে বলা হয়েছে, সংসদের অনুমতি ছাড়া কোনো সদস্য টানা ৯০ কার্যদিবস সংসদের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর আসন শূন্য হতে পারে।

তবে কারাগারে থাকলেই এই বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে—এমনটি সংবিধানে বলা নেই। এক্ষেত্রে সংসদের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না এবং সাংবিধানিক শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা বিবেচনার বিষয়।

অর্থাৎ গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে দীর্ঘদিন সংসদে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি আলাদাভাবে সাংবিধানিকভাবে বিবেচিত হতে পারে।

যেসব কারণে এমপির আসন শূন্য হতে পারে

সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ না নেওয়া;;

সংবিধানের ৬৬(২)-এ উল্লেখিত কোনো অযোগ্যতায় পড়া;

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়া;

এবং সংসদ সদস্য নিজে স্পিকারের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র দেওয়া।

গাজী নজরুল ও মিষ্টির ক্ষেত্রে পার্থক্য কোথায়?

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্ব তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং তিনি নিজে পদত্যাগপত্র দেন। ফলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া সংবিধানে নির্ধারিত পদত্যাগের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু তিনি নিজে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেননি।

ফলে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ হারানো—দুটি আলাদা বিষয়। একইভাবে, কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকাও নিজে থেকেই সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কারণ নয়। সংবিধানে নির্ধারিত অযোগ্যতা বা আসন শূন্য হওয়ার কোনো শর্ত পূরণ হলে তবেই পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হবে।