০১:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রের মহড়া, দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:৪৯:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৯

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ছে বিভিন্ন নামের কিশোর গ্যাংয়ের অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও। কোথাও শতাধিক কিশোরকে রামদা, চাপাতি, সামুরাই, ছুরি ও চাকু হাতে দলবদ্ধভাবে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো ভিডিওতে সামনের সারিতে থাকা কিশোরদের অস্ত্র হাতে নানা অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়। এসব ভিডিওতে ভয়ভীতি ও হামলার হুমকিসংবলিত নানা ক্যাপশনও ব্যবহার করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নাম ও পরিচয়ে এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলা শহরেও দলবদ্ধ কিশোরদের অস্ত্র প্রদর্শন, মারামারি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

নৌপথেও ট্রলার ব্যবহার করে কিশোরদের অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কথা জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোরদের একটি অংশ অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে প্রকাশ করা ভিডিওতে অস্ত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব ভিডিওর কোনো কোনো ক্যাপশনে হামলা ও আতঙ্ক তৈরির বার্তাও রয়েছে।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে নয়, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং নিজেদের প্রভাব জানান দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সব ভিডিওর স্থান, সময় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পুলিশের তালিকায় সারা দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা চার হাজারের বেশি। তালিকাভুক্ত সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ঢাকায় ১৫৮টি গ্যাংয়ে ১ হাজার ২১৯ জন সদস্য সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে। রাজধানীর মধ্যে মোহাম্মদপুরে ২৭টি এবং পল্লবীতে ১৬টি গ্যাং সক্রিয় থাকার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য এখনো সক্রিয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক বা নিয়ন্ত্রণকারী পরিবর্তিত হলেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে কিশোরদের ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, হামলা ও অস্ত্র প্রদর্শনের মতো অপরাধ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদপুর এলাকায় ল ঠেলা গ্রুপ, ভাইব্বা ল কিং, টক্কর ল গ্রুপ, পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, চেতালেই ভেজাল, সাব্বির গ্রুপ, পিচ্চি হেলাল গ্রুপ, মিরাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপ ও বেলচা মনির গ্রুপের নাম বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।

এসব গ্যাংয়ের পেছনে কয়েকজন অপরাধী ও পৃষ্ঠপোষকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক নানা ঘাটতির কারণে কিশোরদের একটি অংশ গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবরের মতো আবাসিক এলাকায় চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যেও কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা রয়েছে।

তিনি বলেন, অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

মিরপুর ও পল্লবী এলাকাতেও একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তালিকায় রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুরাদ গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, জুম্মান গ্রুপ, বাহাদুর গ্রুপ, বাহবালী গ্রুপ, ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, আসাদ কাল্লু গ্রুপ ও দীপ গ্রুপের নাম রয়েছে।

উত্তরার দক্ষিণখানে বিগবস, ইয়ংস্টার ও ব্লাড বয়েজ এবং উত্তরা পূর্ব এলাকায় সসুজন, রাজিব ও খোরশেদ গ্রুপের নামও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তালিকায় রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন অপরাধী ও পৃষ্ঠপোষকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরেও কিশোর অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গা, হালিশহর ও খুলশীসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও জমি দখলের মতো অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায়ও অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার দাবি করা হয়েছে। বগুড়ায় শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

ময়মনসিংহে নগর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে মারামারি, হামলা, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা এবং রংপুর নগরীতেও একাধিক কিশোর অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

অপরাধ বিশ্লেষক মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর মতে, এসব গ্যাংয়ের পেছনে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করে বা কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করে, তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত কিশোরদের সংশোধন, পুনর্বাসন ও পরিবারভিত্তিক নজরদারির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং কেউ গ্যাং কালচারে জড়িয়ে অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না।

কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যার ঘটনার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্লক রেইডসহ বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক, অর্থের উৎস ও অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।

দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্তকরণ এবং কিশোরদের সামাজিক ও পারিবারিক পুনর্বাসন—এই তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বাধিক পঠিত

নড়াইলে ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রের মহড়া, দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য

আপডেট: ০৯:৪৯:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ছে বিভিন্ন নামের কিশোর গ্যাংয়ের অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও। কোথাও শতাধিক কিশোরকে রামদা, চাপাতি, সামুরাই, ছুরি ও চাকু হাতে দলবদ্ধভাবে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো ভিডিওতে সামনের সারিতে থাকা কিশোরদের অস্ত্র হাতে নানা অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়। এসব ভিডিওতে ভয়ভীতি ও হামলার হুমকিসংবলিত নানা ক্যাপশনও ব্যবহার করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নাম ও পরিচয়ে এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলা শহরেও দলবদ্ধ কিশোরদের অস্ত্র প্রদর্শন, মারামারি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

নৌপথেও ট্রলার ব্যবহার করে কিশোরদের অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কথা জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোরদের একটি অংশ অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে প্রকাশ করা ভিডিওতে অস্ত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব ভিডিওর কোনো কোনো ক্যাপশনে হামলা ও আতঙ্ক তৈরির বার্তাও রয়েছে।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে নয়, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং নিজেদের প্রভাব জানান দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সব ভিডিওর স্থান, সময় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পুলিশের তালিকায় সারা দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা চার হাজারের বেশি। তালিকাভুক্ত সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ঢাকায় ১৫৮টি গ্যাংয়ে ১ হাজার ২১৯ জন সদস্য সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে। রাজধানীর মধ্যে মোহাম্মদপুরে ২৭টি এবং পল্লবীতে ১৬টি গ্যাং সক্রিয় থাকার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য এখনো সক্রিয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক বা নিয়ন্ত্রণকারী পরিবর্তিত হলেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে কিশোরদের ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, হামলা ও অস্ত্র প্রদর্শনের মতো অপরাধ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদপুর এলাকায় ল ঠেলা গ্রুপ, ভাইব্বা ল কিং, টক্কর ল গ্রুপ, পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, চেতালেই ভেজাল, সাব্বির গ্রুপ, পিচ্চি হেলাল গ্রুপ, মিরাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপ ও বেলচা মনির গ্রুপের নাম বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।

এসব গ্যাংয়ের পেছনে কয়েকজন অপরাধী ও পৃষ্ঠপোষকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক নানা ঘাটতির কারণে কিশোরদের একটি অংশ গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবরের মতো আবাসিক এলাকায় চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যেও কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা রয়েছে।

তিনি বলেন, অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

মিরপুর ও পল্লবী এলাকাতেও একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তালিকায় রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুরাদ গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, জুম্মান গ্রুপ, বাহাদুর গ্রুপ, বাহবালী গ্রুপ, ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, আসাদ কাল্লু গ্রুপ ও দীপ গ্রুপের নাম রয়েছে।

উত্তরার দক্ষিণখানে বিগবস, ইয়ংস্টার ও ব্লাড বয়েজ এবং উত্তরা পূর্ব এলাকায় সসুজন, রাজিব ও খোরশেদ গ্রুপের নামও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তালিকায় রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন অপরাধী ও পৃষ্ঠপোষকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরেও কিশোর অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গা, হালিশহর ও খুলশীসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও জমি দখলের মতো অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায়ও অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার দাবি করা হয়েছে। বগুড়ায় শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

ময়মনসিংহে নগর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে মারামারি, হামলা, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা এবং রংপুর নগরীতেও একাধিক কিশোর অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

অপরাধ বিশ্লেষক মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর মতে, এসব গ্যাংয়ের পেছনে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করে বা কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করে, তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত কিশোরদের সংশোধন, পুনর্বাসন ও পরিবারভিত্তিক নজরদারির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং কেউ গ্যাং কালচারে জড়িয়ে অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না।

কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যার ঘটনার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্লক রেইডসহ বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক, অর্থের উৎস ও অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।

দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্তকরণ এবং কিশোরদের সামাজিক ও পারিবারিক পুনর্বাসন—এই তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।