১১:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

গুপ্ত’ গ্রাফিতি থেকে প্রকাশ্য সংঘাত, মুখোমুখি ছাত্রদল-ছাত্রশিবির; উত্তপ্ত দেশের ক্যাম্পাসগুলো*

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:২৭:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫১২

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েকদিন ধরে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে। ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার, দেয়াললিখন এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্রসংগঠনের বিরোধ এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা, পাবনা, কুমিল্লা, রাজশাহী ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ, শোডাউন এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ এবং কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার জেরে দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।

পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রশিবিরের একটি মিছিল কলেজ গেটের সামনে পৌঁছালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
ছাত্রশিবিরের দাবি, পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অন্যদিকে ছাত্রদলের অভিযোগ, বহিরাগতদের নিয়ে শিবির ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হামলা চালিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাহবাগে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মী শাহবাগ থানায় যাওয়ার পথে হামলার মুখে পড়েন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা থানার ভেতরে আশ্রয় নেন। অভিযুক্ত শিবির নেতা দাবি করেছেন, তার নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া এবং এ বিষয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি করতে থানায় গিয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি লেখাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেয়ালে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি আঁকা হয়।
এই গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান, বিক্ষোভ এবং অভিযোগের মাত্রা বাড়তে থাকে। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি সংসদে এ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি নেতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়।
ছাত্রসংগঠনগুলোর এই দ্বন্দ্ব এখন তাদের অভিভাবক সংগঠন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। ছাত্রদলের একাংশ ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধের পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও তুলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে এই বিরোধ কেবল একটি শব্দ বা গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে নয়; এর পেছনে রয়েছে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, ‘গুপ্ত’ শব্দটি কেবল একটি উপলক্ষ। প্রকৃত কারণ হলো ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। এটি শিক্ষাঙ্গনের জন্য অশনিসংকেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, এ ধরনের বিরোধ চলতে থাকলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সংঘাতমুক্ত রাখতে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অন্যথায়, এই উত্তেজনা যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

সর্বাধিক পঠিত

২৭ এপ্রিল যশোর সফর ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি, শহরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ

গুপ্ত’ গ্রাফিতি থেকে প্রকাশ্য সংঘাত, মুখোমুখি ছাত্রদল-ছাত্রশিবির; উত্তপ্ত দেশের ক্যাম্পাসগুলো*

আপডেট: ১০:২৭:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েকদিন ধরে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে। ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার, দেয়াললিখন এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্রসংগঠনের বিরোধ এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা, পাবনা, কুমিল্লা, রাজশাহী ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ, শোডাউন এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ এবং কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার জেরে দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।

পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রশিবিরের একটি মিছিল কলেজ গেটের সামনে পৌঁছালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
ছাত্রশিবিরের দাবি, পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অন্যদিকে ছাত্রদলের অভিযোগ, বহিরাগতদের নিয়ে শিবির ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হামলা চালিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাহবাগে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মী শাহবাগ থানায় যাওয়ার পথে হামলার মুখে পড়েন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা থানার ভেতরে আশ্রয় নেন। অভিযুক্ত শিবির নেতা দাবি করেছেন, তার নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া এবং এ বিষয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি করতে থানায় গিয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি লেখাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেয়ালে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি আঁকা হয়।
এই গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান, বিক্ষোভ এবং অভিযোগের মাত্রা বাড়তে থাকে। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি সংসদে এ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি নেতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়।
ছাত্রসংগঠনগুলোর এই দ্বন্দ্ব এখন তাদের অভিভাবক সংগঠন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। ছাত্রদলের একাংশ ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধের পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও তুলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে এই বিরোধ কেবল একটি শব্দ বা গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে নয়; এর পেছনে রয়েছে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, ‘গুপ্ত’ শব্দটি কেবল একটি উপলক্ষ। প্রকৃত কারণ হলো ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। এটি শিক্ষাঙ্গনের জন্য অশনিসংকেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, এ ধরনের বিরোধ চলতে থাকলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সংঘাতমুক্ত রাখতে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অন্যথায়, এই উত্তেজনা যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।