০৬:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্মাণকাজের কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো, নিহত ২০

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৬:২৯:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫১০

নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই নিহত হন বলে জানিয়েছে এসআরবি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান।

এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি না দিয়ে তাঁদের দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিদের যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের কেন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিপক্ষ তাঁদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালালে সেই হামলার মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম, মধ্য ও শেষ—এই তিন ভাগে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।

জীবিতদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর বরাত দিয়ে আসাদুজ্জামান জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এরপর বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।

অন্যদিকে, বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অপর ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

এই মানব পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে এসআরবি। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান সংস্থাটির কর্মকর্তা।

আসাদুজ্জামান আরও বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একইভাবে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারাও রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন স্বজনদের মৃত্যুর খবর পেলেও অনেক পরিবার মরদেহ দেখতে পারছে না, এমনকি দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগও পাচ্ছে না।

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পাশাপাশি বিদেশযাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন এসআরবির এই কর্মকর্তা।

সর্বাধিক পঠিত

দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, অনুপ্রেরণাদায়ী তিন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী

নির্মাণকাজের কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো, নিহত ২০

আপডেট: ০৬:২৯:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই নিহত হন বলে জানিয়েছে এসআরবি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান।

এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি না দিয়ে তাঁদের দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিদের যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের কেন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিপক্ষ তাঁদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালালে সেই হামলার মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম, মধ্য ও শেষ—এই তিন ভাগে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।

জীবিতদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর বরাত দিয়ে আসাদুজ্জামান জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এরপর বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।

অন্যদিকে, বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অপর ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

এই মানব পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে এসআরবি। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান সংস্থাটির কর্মকর্তা।

আসাদুজ্জামান আরও বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একইভাবে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারাও রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন স্বজনদের মৃত্যুর খবর পেলেও অনেক পরিবার মরদেহ দেখতে পারছে না, এমনকি দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগও পাচ্ছে না।

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পাশাপাশি বিদেশযাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন এসআরবির এই কর্মকর্তা।