জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম, অপচয় ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নেওয়া এ কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের সদস্য এবং অন্য জেলার বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা। অভিযোগকারীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ না দিয়েই প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রশিক্ষকের সম্মানী, মাঠকর্মীদের বেতনসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভুয়া ব্যাংক হিসাব, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে গৌরীপুর, হালুয়াঘাট, ফুলবাড়িয়া ও ত্রিশাল উপজেলায় প্রায় ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গৌরীপুরে প্রায় ৫২ কোটি, হালুয়াঘাটে ৩৭ কোটি, ফুলবাড়িয়ায় ৪৪ কোটি এবং ত্রিশালে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। তবে এসব অর্থের কত অংশ প্রকৃতপক্ষে আত্মসাৎ হয়েছে, তা তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
ত্রিশাল উপজেলায় কর্মসূচির অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তে ভুয়া ব্যাংক হিসাব ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় সরকারি কোষাগারে ৫৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া একই দিনে জেলার একাধিক উপজেলায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্য দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোর দূরত্ব বিবেচনায় একজন প্রশিক্ষকের পক্ষে একই সময়ে একাধিক স্থানে উপস্থিত থাকা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ময়মনসিংহের কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষকের নামে বিপুলসংখ্যক ক্লাস দেখানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনের নামে ৪৫২টি, সহকারী পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীর নামে ৪৩৪টি, জোয়াহের আলী মিয়ার নামে ৪৩৪টি এবং আবু জুলহাসের নামে ৮৩৩টি ক্লাস দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া আরও কয়েকজন কর্মকর্তা, শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের নামে শত শত ক্লাস দেখিয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।?
অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত বেকার যুবক-যুবতীদের পরিবর্তে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
অভিযোগে ত্রিশালে ১৯৫ জন, ফুলবাড়িয়ায় ২১২ জন, হালুয়াঘাটে ৮৮ জন এবং ফুলপুর-তারাকান্দায় ৩২০ জনকে কর্মসূচির আওতায় দেখানোর কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের পরিবর্তে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগও করা হয়েছে।
কর্মসূচিতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ এবং সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে মামলা করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মামলায় কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার দুই কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পৃথক তদন্ত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া সরেজমিন তদন্ত শেষে জেলা প্রশাসন ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তর থেকে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন চেয়ে দুটি চিঠি দেওয়া হয় এবং তাকে প্রতিবেদনসহ সচিবের দপ্তরে তলব করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদন হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কারা দায়ী এবং এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বেকার যুবক ও নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করা হয়। কর্মসূচির আওতায় বেকার যুবক-যুবতীদের তিন মাস প্রশিক্ষণের পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুই বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।
প্রশিক্ষণকালীন প্রতিদিন ১০০ টাকা ভাতা এবং চাকরিতে যোগদানের পর মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১৩ বছরে কর্মসূচিটিতে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া প্রশিক্ষণ ও অনিয়মের মাধ্যমে কর্মসূচির অর্থের একটি অংশ অপচয় বা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও সাবেক কর্মকর্তার নাম এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাত ও অপচয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত প্রতিবেদন, ব্যাংক লেনদেন ও আদালতের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযুক্ত প্রত্যেকের বক্তব্য নেওয়াও জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।




















