যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় দুধে ভেজালের অভিযোগ তুলে চার দুধ বিক্রেতাকে একটি চিলিং সেন্টারের কক্ষে আটকে রেখে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ঝিকরগাছা থানার তৎকালীন এএসআই আজিজুল ইসলাম ও এক কনস্টেবলের বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়ার মধ্যস্থতায় ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত এএসআইয়ের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে তা গ্রহণ না করে ভয়ভীতি দেখানো এবং অভিযোগপত্র ছিঁড়ে ফেলারও অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা হলেন উপজেলার বারবাকপুর ঘোষপাড়া গ্রামের তুষার ঘোষ, অশোক ঘোষ, মিলন ঘোষ এবং তাদের ভাগনে উজ্জ্বল ঘোষ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২২ জুন রাত ১০টার দিকে তুষার ঘোষ বারবাকপুর হাটখোলা বাজারে প্রাণ কোম্পানির চিলিং সেন্টারে দুধ বিক্রি করতে যান। এ সময় সাদা পোশাকে অবস্থানরত এএসআই আজিজুল ইসলাম ও কনস্টেবল মো. আশিক দুধে ভেজালের অভিযোগ তুলে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখেন।
এরপর পর্যায়ক্রমে অশোক ঘোষ, মিলন ঘোষ ও উজ্জ্বল ঘোষ দুধ নিয়ে সেখানে পৌঁছালে একই অভিযোগে তাদেরও জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রাণ কোম্পানির প্রতিনিধিরা দুধ পরীক্ষা করে কোনো ভেজাল পাননি। কিন্তু এএসআই আজিজুল সেই ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি তিনি নিজে আঙুল দিয়ে দুধ পরীক্ষা করে বলেন, এতে হরলিক্স মেশানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ঘটনার একপর্যায়ে স্থানীয় কামাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলে এসে মধ্যস্থতা করেন। তার উপস্থিতিতে এএসআই আজিজুল প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা হয়।
তারা জানান, তাৎক্ষণিকভাবে এত টাকা জোগাড় করতে না পারায় মধ্যস্থতাকারী কামাল হোসেন এএসআই ও কনস্টেবলের হাতে দুই লাখ ৪৫ হাজার টাকা তুলে দেন এবং বাকি ১৫ হাজার টাকা পরে দেওয়ার কথা হয়। পরদিন ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার-দেনা করে পুরো টাকা কামালের মাধ্যমে পরিশোধ করেন।
এদিকে প্রাণ কোম্পানি দুধে কোনো ভেজাল না পাওয়ায় পরে সেই দুধ গ্রহণ করে।
ভুক্তভোগী তুষার ঘোষ বলেন, সংখ্যালঘু হওয়ায় তাদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। পরে গ্রামবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে ২৪ জুন থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু ডিউটি অফিসার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, পরে এএসআই আজিজুল তাদের থানার ভেতরে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখান এবং অভিযোগের কপি ছিঁড়ে ফেলেন।
তুষার ঘোষ আরও জানান, পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানো হলে থানার ওসি গোলাম কিবরিয়া তাদের থানায় ডাকেন। সেখানে আলোচনার পর এএসআই আজিজুল ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া পুরো টাকা ফেরত দেন।
বারবাকপুর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, অভিযোগপত্র ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা জানার পর তিনি স্থানীয় নেতাদের নিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে ওসি অভিযুক্ত এএসআইকে এক ঘণ্টার মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
প্রাণ কোম্পানির ঝিকরগাছা এরিয়া ম্যানেজার জানান, ঘটনার সময় কোম্পানির প্রতিনিধি দুধ পরীক্ষা করে কোনো ভেজাল পাননি। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলেও তারা তা আমলে নেয়নি। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে তিনি রাতে চিলিং সেন্টারে পৌঁছান। তখন পুলিশ সেখানে আর উপস্থিত ছিল না।
অভিযুক্ত এএসআই আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করে শুধু বলেন, তিনি বাগেরহাটে বদলি হয়েছেন।
ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে বাগেরহাটে বদলি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, থানার প্রধান হিসেবে পুরো ঘটনায় ওসির দায়বদ্ধতার বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে নাভারণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আরিফ হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।














